তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে ডিজিটাল বিপ্লব যখন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, ঠিক তখনই মুদ্রার উলটো পিঠ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে ভয়ংকর ‘সাইবার স্ক্যাম’। বৃহস্পতিবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনলাইনে পার্টটাইম কাজ, মুভি রেটিং বা ইউটিউবে লাইক-শেয়ারের মতো সহজ কাজের টোপ দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। শুরুতে বিশ্বাস অর্জনের জন্য কয়েকশ টাকা লভ্যাংশ হিসাবে দিয়ে ভুক্তভোগীর মনে আস্থার জন্ম দেওয়া হয়।
এরপর ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’ বা ‘ইনভেস্টমেন্ট’র দোহাই দিয়ে ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে সর্বস্ব। এ চক্রের ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়; এই প্রতারণার জাল দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাইরেও। তথ্য বলছে, উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের পাচার করা হচ্ছে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার বা লাওসের মতো দেশগুলোতে। সেখানে নিয়ে তাদের অস্ত্রের মুখে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। যারা অন্যকে প্রতারিত করার এই অনৈতিক কাজ করতে পারছেন না বা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছেন না, তাদের ওপর নেমে আসছে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং এই স্ক্যাম সেন্টারগুলো এখন আধুনিক দাসত্বের এক নতুন বধ্যভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আমাদের সচেতন হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির দুনিয়ায় ‘সহজ উপায়ে অনেক টাকা আয়’-এমন কোনো অফার আদতে অস্তিত্বহীন। কোনো অপরিচিত উৎস থেকে আসা লিংকে ক্লিক করা, টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে অপরিচিত ব্যক্তির নির্দেশনায় অর্থ বিনিয়োগ করা মানেই হলো নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা। আমাদের মনে রাখা জরুরি, কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি কখনোই টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে সাধারণ মানুষের কাছে আমানত বা বিনিয়োগ দাবি করে না। যারা চাকরির সন্ধানে বিদেশ যেতে চাচ্ছেন, তাদের অবশ্যই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা যাচাই করে নেওয়া বাধ্যতামূলক। তাছাড়া পর্যটন ভিসায় বিদেশে গিয়ে কাজের সন্ধান করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ানো কোনোভাবেই উচিত নয়।
আমাদের দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করে যেভাবে বিদেশে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ব্যাংক খাতের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। ভুয়া নামে বা অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা বন্ধে আরও আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সিআইডি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা আশা জাগালেও এই আন্তর্জাতিক মেগা-চক্রকে মোকাবিলায় সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ ও নিরবচ্ছিন্ন জনসচেতনতা জরুরি। প্রত্যেক নাগরিকের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অস্বাভাবিক লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখলে সেটিকে এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে রিপোর্ট করা।
মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল দুনিয়ায় একটি অসতর্ক ক্লিক কেড়ে নিতে পারে জীবনের সব সঞ্চয়, এমনকি বিপন্ন করতে পারে জীবনও। অপরিচিত নম্বর বা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আসা লোভনীয় প্রস্তাব বিনাবাক্যে প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হওয়া এবং নিকটস্থ সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে অবহিত করা জরুরি। ভুলে গেলে চলবে না, লোভের চেয়ে জীবন ও অর্জিত সম্পদের নিরাপত্তাই বড়। আর এই সচেতনতাই হলো স্ক্যামারদের পাতা ফাঁদ থেকে বাঁচার একমাত্র কার্যকর উপায়।